ইতিহাস: প্রাচীনকাল থেকে ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ বিবরণ

Image from Pexels

বাংলাদেশের জন্ম এক গৌরবময় ও বেদনাদায়ক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে। হাজার বছরের সমৃদ্ধ সভ্যতা, নানা শাসনামল এবং এক রক্তঝরা মুক্তিসংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের এই স্বাধীন দেশটি গড়ে উঠেছে।


১. প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভিত্তি (খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দ – ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ)

প্রাচীন বাংলা পুণ্ড্র, বঙ্গ, গৌড়ের মতো স্বাধীন জনপদে বিভক্ত ছিল। বৌদ্ধ পাল ও হিন্দু সেন রাজবংশের পর, ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয় মুসলিম শাসনের যুগ। ইলিয়াস শাহী ও হুসেন শাহী বংশের স্বাধীন সুলতানিরা এবং পরবর্তীতে মুঘলরা বাংলাকে "দেশের স্বর্গ"-এ পরিণত করে।


২. ঔপনিবেশিক শোষণ ও জাগরণ (১৭৫৭ – ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ)

পলাশীর যুদ্ধের (১৭৫৭) পর বাংলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়। শোষণ ও দুর্ভিক্ষ সত্ত্বেও এ সময়েই জন্ম নেয় বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা, যা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে প্রকাশ পায়।


৩. পাকিস্তান আমল ও স্বাধিকারের লড়াই (১৯৪৭ – ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ)

১৯৪৭-এ বিভক্ত হয়ে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের অংশ হয়। কিন্তু শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির স্বাধীনচেতা আত্মার প্রথম প্রকাশ। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা হয়ে ওঠে স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালিরা স্বাধীনতার পক্ষেই রায় দেয়।


৪. মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার জন্ম (১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ)

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ জাতিকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার পর, ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাঁর নামে প্রচারিত এই ঘোষণার ভিত্তিতেই শুরু হয় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ।


মুজিবনগরে গঠিত অস্থায়ী সরকারের নেতৃত্বে (রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ) নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়।


৫. স্বাধীনতা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ ও পথচলা (১৯৭২ – বর্তমান)

স্বাধীনতার প্রথম বছরে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার পাশাপাশি রক্ষীবাহিনী গঠন, ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন এবং নভেম্বরে কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়, যা দেশকে দীর্ঘ অস্থিরতার দিকে ঠেলে দেয়।


৬. গণতন্ত্রের চড়াই-উতরাই ও সাম্প্রতিক পরিবর্তন

এরপরের দশকগুলোতে সামরিক শাসন, সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনের মতো অধ্যায় জুড়ে থাকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশ এগিয়েছে।


২০১৮ ও ২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন ব্যাপক গণআন্দোলনের রূপ নেয়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই সরকার একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে কাজ করছে।


বর্তমান বাংলাদেশ তার সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও সুদৃঢ় করতে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে কাজ করে যাচ্ছে, যার ভিত্তি হলো এই জাতির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা।

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন